আজকাল তার বড় অস্থির লাগে।
বিরাশি বছরের জীবনে এমন অস্থিরতা কখনও বোধ করেছেন বলে মনে পড়ে না। কিন্তু গত কয়েকদিন চঞ্চলতা পেয়ে বসেছে। মনে হচ্ছে কোথায় যেন এক শূন্যতা; কোথাও তার যাওয়ার কথা, কিন্তু এখনও যাওয়া হয়নি। মাঝে মাঝে তার স্ত্রীর কথা মনে পড়ছে। দুই বছর মহিলা তাকে একেবারেই একা রেখে পরপারে চলে গিয়েছেন। এক ছেলে, এক মেয়ে । তারা তাদের ঘর-সংসার নিয়ে ব্যস্ত। কেউ হয়তো ছুটির বিকেলে এসে কিছুক্ষণের জন্য ঘুরে যায়। আসার সময় কিছু খাবার-দাবার নিয়ে আসে। তারা তাকে খুবই ভালবাসে। আন্তরিক ভাবেই জানতে চায় তার কি লাগবে? আর কিছু আনতে হবে কিনা? কোথাও বেড়াতে যাবে কিনা? তাদের উপস্থিতি ভালই লাগে। কিন্তু তারা চলে গেলে শূন্যতাটা আরও অসহ্য হয়ে ওঠে। সেদিন বিকেলে মেয়েটা তার ছোট দুই নাতনীকে নিয়ে এসেছিল। অনেকক্ষণ তারা নানার পাশে বশে বকবক করলো। আস্তাবলের ঘোড়া তিনটের সঙ্গে খেলার চেষ্টা করলো। রাতে যাওয়ার আগে মেয়ে তাকে শরীরের যত্ন নেওয়ার নানান উপদেশ দিলো।
ঘুম তার অনেক দিন ধরেই বেশ পাতলা। বিছানার পাশের জানলা গলিয়ে জ্যোৎস্না ঢেলে পড়ছে। উঠে বারান্দায় বসে কিছুক্ষণ জ্যোৎস্না ধোয়া উঠোনের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকেন। ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক শুনতে থাকেন।
ভোরের আলো ফোটার আগেই তিনি ঘোড়ার পিঠে চেপে বসেন।
ছোট ছোট কদমে ঘোড়া ছুটে চলেছে। তিনি বুক ভরে দম নিচ্ছেন। আর চার পাশের প্রকৃতি গাছ লতা পাতা চোখ ভরে দেখছেন। কত চেনা মাঠ ঘাট। ইচ্ছে হয় সবকিছু হাত দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতে। প্রতিবেশী অনেকে তাকে দেখে অবাক হয়। সাত সকালে কোথায় চলেছেন জানতে চায়। তিনি মৃদু হাসেন। নিচু কণ্ঠে বলেন, “অনেক দিন বের হই না। যাই একটু ঘুরে আসি”।
বৃদ্ধ অশ্বারোহী চলতে থাকেন। পুরনো স্মৃতি জড়ানো পথ মাড়িয়ে ঘোড়া চলতে থাকে। সেই খেলার মাঠ। সেই নদী। কৈশোর, যৌবনের কত দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে যায়।
দুপুর হয়। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়। রাতের চাদরে ঢেকে যায় চারদিক। আবার পূব আকাশে সূর্য ওঠে। তাকে নেশায় পেয়ে বসে। উনি চলতে থাকেন। চেনা পথ এবং প্রকৃতির মাঝে নিজেকে অনুভব করতে থাকেন। এভাবে কতদিন পার হয় হয়তো সেটা তার নিজেরও মনে নেই।
শ্রান্ত ক্লান্ত বিরাশি বছর বয়সের শরীর টেনে তিনি যখন ছয় সপ্তাহ পরে নিজের বাড়ীর দরজায় ঢুকলেন তখন চারদিকে বড়দিনের আয়োজন চলছে। ঘরে ঢুকে লাইট না জ্বালিয়ে সোজা বিছানায় শুয়ে পড়লেন। আজ তার মনে পরম এক প্রশান্তি। আর কোন অস্থিরতা, কোন চঞ্চলতা অনুভব করেন না। আস্তে আস্তে ঘুমের ভারে তার চোখ দুটো বুজে আসে।
বড়দিনের সকালে তার পুত্র শুভেচ্ছা জানাতে এসে দেখতে পায় ক্লান্ত অশ্বারোহী তখনও গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। কিন্তু তার পুত্র তাকে আর ঘুম থেকে জাগাতে পারেনি।
