Wednesday, 18 June 2014

একটি এনগেজমেন্ট রিংয়ের গল্প

মেয়েদের জীবনে এনগেজমেন্ট রিং যে এত আনন্দের বিষয় তা আসলে আগে খেয়াল করিনি। খেয়াল করিনি বললে ভুল হবে। মানে সেভাবে এটা চোখে পড়েনি। টিয়া নামে একটি মেয়ে আমার সঙ্গে কাজ করে। এমনিতে খুব চুপচাপ শান্ত স্বভাবের। ওকে দেখে আমার কেন যেন বাংলার সরল বধুর ছবি মনে পড়ে। কিন্তু টপস স্কার্ট পরা টিয়া নিখাদ অস্ট্রেলিয়ান সোনালী চুলওয়ালা সাদা চামড়ার মেয়ে।
সেদিন সকালে হাসতে হাসতে টিয়া আমার দিকে এগিয়ে এলো।     
“গুড মর্নিং” বলেই টিয়া জিজ্ঞেস করে,“জানো গত সন্ধ্যায় কি ঘটেছে?” আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাই। টিয়া তার আঙুলগুলি এগিয়ে দিলো। রিং ফিঙ্গারে জ্বল জ্বল করছে একটি হীরের আংটি। বোঝা যায় অনেক পুরনো অ্যান্টিক আংটি, কিন্তু হীরেটা অনেক বড়। হীরের দ্যুতির মতোই ওর চোখ-মুখ দিয়ে খুশী আর আনন্দ ঝরছে। জিজ্ঞেস করলাম, “ব্যাপারটা কি?”
টিয়া কথা বলে খরস্রোতা নদীর মতোওর কথার বন্যার ভিতর থেকে বুঝলাম এটা এনগেজমেন্টের রিং। গতকাল দিনটা ওর শুরু হয়েছিল সাদামাটা ভাবেই। বরাবরই দেখেছি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মেয়েটি কম্পিউটারে মাথা গুঁজে কাজ করে। গতকাল সন্ধ্যার সময় ওর বন্ধু জন তাকে কফি খেতে ডেকেছিল। জন আইটি সেকশনে কাজ করে। বেশ কিছুদিন ধরে ওদের বন্ধুত্ব চলছিল। তাই টিয়া ওর সঙ্গে কফি খেতে সাগর তীরে চলে যায়। তখন গোধূলি। সাগরের তীরে ঢেউ দেখতে দেখতে মাতাল হাওয়ার মাঝে বালুর ওপর দুজনে বসে কফি খাচ্ছিল। আর তখনই জন কাজটি করে। সে টিয়াকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে?”  টিয়া খুব অবাক হয়েছিল। আনন্দ এবং উত্তেজনায় তার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। কিন্তু সে এই মুহূর্তটির জন্যইতো অপেক্ষা করছিলো। তার মাথা ঝুঁকানো দেখেই জন পকেট থেকে হীরের আংটিটি বের করে তার হাতে পড়িয়ে দেয়। টিয়া অ্যান্টিক জিনিস বেশী পছন্দ করে। এই জন্য জন অ্যান্টিক শপ থেকে দ্বিগুণ দাম দিয়ে দেড়শ বছর পুরনো হীরের আংটিটি কিনেছে। আংটি হাতে টিয়ার  চোখ থেকে ঝর ঝর করে পানি পড়তে থাকে। তখন পশ্চিম আকাশে সূর্য সাগরে ডুবছে।
টিয়া বাসায় ফিরতে চায়। কিন্তু জন তাকে তার বাসায় যেতে আমন্ত্রণ জানায়।
ওরা যখন জনের বাসায় পৌঁছায় তখন রাতের ডিনারের সময় হয়ে গিয়েছে।
ডিনার টেবিলে টিয়ার জন্য আরও সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছিলো। টেবিলে ডিনারের নানা পদের খাবার সাজানো রয়েছে। কিন্তু তারচেয়ে বড় কথা জনের বাবা-মা, বড় বোন এবং বোনের হাজব্যান্ডসহ টিয়ার বাবা-মা এবং আরও কয়েকজন অপেক্ষা করছেনজন ওকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য এসব আয়োজনের কথা আগে বলেনি।
টিয়া আমাকে এই গল্প বলতে বলতে তার জীবনের সেরা ডিনার নাইটের স্মৃতিতে হারিয়ে যায়  মনে হয়আমি অবাক হয়ে ওর দিকে অপলক তাকিয়ে থাকি। একটি সুখী মেয়ের মুখ দেখি। ওর মুখখানি হীরের মতোই জ্বল জ্বল করছে। আমি ওকে অভিনন্দন জানাই। কিন্তু সেটা সে শুনতে পায় কিনা বোঝা যায় না।
এনগেজমেন্টের আংটি পরা টিয়ার আনন্দ দেখে আমার একটা কথাই মনে হয়। আধুনিকতা বলি আর পশ্চিমা সভ্যতা বলি, চিরন্তন নারীর এই মধুর রূপ হারিয়ে যাওয়ার নয়।

  

Friday, 7 February 2014

একজন অশ্বারোহীর তাকে আলিঙ্গন


আজকাল তার বড় অস্থির লাগে। 
বিরাশি বছরের জীবনে এমন অস্থিরতা কখনও বোধ করেছেন বলে মনে পড়ে না। কিন্তু গত কয়েকদিন চঞ্চলতা পেয়ে বসেছে। মনে হচ্ছে কোথায় যেন এক শূন্যতা; কোথাও তার যাওয়ার কথা, কিন্তু এখনও যাওয়া হয়নি। মাঝে মাঝে তার স্ত্রীর কথা মনে পড়ছে। দুই  বছর মহিলা তাকে একেবারেই একা রেখে পরপারে চলে গিয়েছেন। এক ছেলে, এক মেয়ে । তারা তাদের ঘর-সংসার নিয়ে ব্যস্ত। কেউ হয়তো ছুটির বিকেলে এসে কিছুক্ষণের জন্য ঘুরে যায়। আসার সময় কিছু খাবার-দাবার নিয়ে আসে। তারা তাকে খুবই ভালবাসে। আন্তরিক ভাবেই জানতে চায় তার কি লাগবে? আর কিছু আনতে হবে কিনা? কোথাও বেড়াতে যাবে কিনা? তাদের উপস্থিতি ভালই লাগে। কিন্তু তারা চলে গেলে শূন্যতাটা আরও অসহ্য হয়ে ওঠে। সেদিন বিকেলে মেয়েটা তার ছোট দুই নাতনীকে নিয়ে এসেছিল। অনেকক্ষণ তারা নানার পাশে বশে বকবক করলো। আস্তাবলের ঘোড়া তিনটের  সঙ্গে খেলার চেষ্টা করলো। রাতে যাওয়ার আগে মেয়ে তাকে শরীরের যত্ন নেওয়ার নানান উপদেশ দিলো।
ঘুম তার অনেক  দিন ধরেই বেশ পাতলা। বিছানার পাশের জানলা গলিয়ে জ্যোৎস্না ঢেলে পড়ছে। উঠে বারান্দায় বসে কিছুক্ষণ জ্যোৎস্না ধোয়া উঠোনের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকেন। ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক শুনতে থাকেন। 
ভোরের আলো ফোটার আগেই তিনি ঘোড়ার পিঠে চেপে বসেন।
ছোট ছোট কদমে ঘোড়া ছুটে চলেছে। তিনি বুক ভরে দম নিচ্ছেন। আর চার পাশের প্রকৃতি গাছ লতা পাতা  চোখ ভরে দেখছেন। কত চেনা মাঠ ঘাট। ইচ্ছে হয় সবকিছু হাত দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতে। প্রতিবেশী অনেকে তাকে দেখে অবাক হয়। সাত সকালে কোথায় চলেছেন জানতে চায়। তিনি মৃদু হাসেন। নিচু কণ্ঠে বলেন, “অনেক দিন বের হই না। যাই একটু ঘুরে আসি”।
বৃদ্ধ অশ্বারোহী চলতে থাকেন। পুরনো স্মৃতি জড়ানো পথ মাড়িয়ে ঘোড়া চলতে থাকে। সেই খেলার মাঠ। সেই নদী। কৈশোর, যৌবনের কত দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে যায়।
দুপুর হয়। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়। রাতের চাদরে ঢেকে যায় চারদিক। আবার পূব আকাশে সূর্য ওঠে। তাকে নেশায় পেয়ে বসে। উনি চলতে থাকেন। চেনা পথ এবং প্রকৃতির মাঝে নিজেকে অনুভব করতে থাকেন। এভাবে কতদিন পার হয় হয়তো সেটা তার নিজেরও মনে নেই।
শ্রান্ত ক্লান্ত বিরাশি বছর বয়সের শরীর টেনে তিনি যখন ছয় সপ্তাহ পরে নিজের বাড়ীর দরজায় ঢুকলেন তখন চারদিকে বড়দিনের আয়োজন চলছে। ঘরে ঢুকে লাইট না জ্বালিয়ে সোজা বিছানায় শুয়ে পড়লেন। আজ তার মনে পরম এক প্রশান্তি। আর কোন অস্থিরতা, কোন চঞ্চলতা অনুভব করেন না। আস্তে আস্তে ঘুমের ভারে তার চোখ দুটো বুজে আসে।
বড়দিনের সকালে তার পুত্র শুভেচ্ছা জানাতে এসে দেখতে পায় ক্লান্ত অশ্বারোহী তখনও গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। কিন্তু তার পুত্র তাকে আর ঘুম থেকে জাগাতে পারেনি।