Wednesday, 3 September 2014

জব্বরুদ্দীনের “বাহাত্তুরে পাওয়া”


জব্বরুদ্দীনের বয়স ৭২ বছর। আসলেও তাকে “বাহাত্তুরে” পেয়েছে। বয়সকালে অস্বাভাবিক আচরণ করলে গ্রামের মানুষ তাকে “বাহাত্তুরে পাওয়া” বলে। বাংলার গ্রামীণ জনগণের চিকিৎসা শাস্ত্রের জ্ঞান আসলেই প্রশংসনীয়। কারণ আমরা যাকে বার্ধক্যজনিত বুদ্ধিভ্রংশতা বা ডিমেন্সিয়া বলি সেটা আসলে বাহাত্তুরে পাওয়াই বটে। জিজ্ঞেস করলাম, “আপনাকে এ পরামর্শ কে দিলো”। তার জবাবে বেশ দীর্ঘ এক কাহিনী শুনলাম।

জব্বরুদ্দীনের স্ত্রী পরলোকগমন করেছেন অনেকদিন। কিছুদিন যাবৎ খুব একা বোধ করছিলেন। সেটাও সহনীয়। কিন্তু সম্প্রতি নারী সহবাসের ইচ্ছে তার অদম্য হয়ে উঠেছিলো। তার ভাষায় “বয়সকালেও কখনও এত উতলা হইনি”। ওদিকে প্রস্রাবের কিছু সমস্যা ছিল। রাতে অন্তত আট-দশ বার উঠতে হয়, প্রস্রাব শেষ হয়েও শেষ হয় না। তাই তিনি গ্রামের স্থানীয় এক গণ্যমান্য হাতুড়ে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। ডাক্তার সাহেবের পরামর্শ তার মনে ধরল। আর মনে ধরবেই বা না কেন। হাতুড়ে ডাক্তার সাহেব তো আর আজকের ডাক্তার না। তার পিতা-প্রপিতামহ সবাই খুব নামকরা হাতুড়ে ডাক্তার ছিল। তার রোগ ধরতে বিলম্ব হয় না। আর চিকিৎসা তো ধন্বন্তরি।

অতএব ডাক্তারের পরামর্শ শুনে জব্বরুদ্দীন আর দেরী করেননি। সপ্তাহ না ঘুরতেই হুরমতীকে বিয়ে করে ঘরে তুলেছেন। বাপ-মা মরা মেয়ে। কেউ দেখা শোনার নাই। নানাজনের দান খয়রাতের ওপর চলে। তাই ভাবলেন মেয়েটারও একটা গতি হয়, আবার তার অসুখেরও চিকিৎসা হয়।
গ্রামের লোকজন ভরপেট যিয়াফত খেয়ে জব্বরুদ্দীন আর হুরমতীর সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য দোয়া করতে করতে ঘরে ফিরল। দুষ্টজনেরা হয়তো একটু-আধটু রসিকতা করেছিল। কিন্তু সবার কথায় কান দিলে কি আর ঘর সংসার চলে?

পরের তিন মাস জব্বরুদ্দীনের জীবন ধারা পালটে গেল। নতুন বউয়ের  যত্নআত্তিতে তার ভুঁড়ি যতই স্ফীত হয়ে উঠতে শুরু করলো, রাতে হুরমতীর মেজাজ ততই সপ্তমে উঠতে শুরু করলো। হুরমতীর আর দোষ কি? বয়স তো তার মোটে একুশ। জব্বরুদ্দীন ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না তিন মাস আগের  মনের সে ইচ্ছেগুলো কোথায় উবে গেল?

হঠাৎ দিন-দুয়েক পরে তার প্রস্রাব বন্ধ হয়ে গেল। সে এক যন্ত্রণার সমস্যা। শহরে বড় হাসপাতালে গিয়ে তার অপারেশন করাতে হল। তার প্রোস্টেট অপারেশন করা হয়েছে। অপারেশনের ডাক্তার তাকে সতর্ক করে দিয়েছেন যে স্ত্রী হয়তো তার ওপর নারাজ থাকবে। কিন্তু ব্যাপারটা যে এত গুরুতর তা জব্বরুদ্দীন আগে বুঝতে পারেন নি। হাতুড়ে ডাক্তার সাহেবও তাকে খুলে বলেননি।
পুরুষের প্রোস্টেট গ্রন্থি বয়স হলে বেড়ে যায়। তখন আরও অনেক উপসর্গের সঙ্গে তাদের যৌন কামনাও কখনও কখনও বেড়ে যায়। অনেকে এ সময় নতুন করে বিয়ে করে কিংবা অন্য পথে চলে। কিন্তু কিছুদিন পরে আবার যৌন ক্ষমতা কমে যায়। আর প্রোস্টেট অপারেশনের পরে জটিলতার কারণেও এটা কমে যেতে পারে। জব্বরুদ্দীনের সেটাই হয়েছে। কিন্তু জব্বরুদ্দীনকে কে বোঝাবে? আর হুরমতীকেই কে বোঝাবে?

হাতুড়ে ডাক্তার সাহেবকে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তিনি এবার তার হাতে ভায়াগ্রা ধরিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু জব্বরুদ্দীন খেতে সাহস পাননি। একবার তার পরামর্শে বিয়ে করে মুসিবতে আছেন। আবার এটা খেয়ে কি হয় না হয় ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না। ওদিকে হুরমতী হুমকি দিয়েছে কোন এক তালতো ভাই নাকি তাকে নিয়ে যেতে চায়।

জব্বরুদ্দীন এখন কি করবেন?

Saturday, 26 July 2014

কার্বন কপি


আগে এখনকার মতো ফটোকপি মেশিন ছিলনা, স্ক্যানারও ছিল না। কোন কিছু কপি করতে হলে আমরা কার্বন পেপার ব্যবহার করতাম। এখন তো কার্বন পেপারের চল প্রায় উঠেই গিয়েছে। কোন লেখা কপি করার জন্য কার্বন পেপার দিয়ে লিখলে কি সুন্দর হুবহু লেখাটা উঠত। আমি অনেক কিছু দেখেই অকারণে অবাক হই। কার্বন পেপারে লেখা দেখে অবাক হওয়া আমার জীবনের প্রথম অবাক হওয়ার মতো একটি বিষয়। একথা কেন আসলো সেটাই বলছি।

সেদিন বিকেলে দেখি টিয়া আর তার বান্ধবী কম্পিউটারের ওপর ঝুঁকে কি যেন খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে। আমি কৌতূহলী হয়ে ওদের দিকে এগিয়ে গেলাম  
জেসি এক গাল হেসে বলল, “টিয়ার ওয়েডিং গাউন পছন্দ করছি”

দেখলাম পিনটারেস্টের পেজে অনেক ওয়েডিং গাউনের ছবি। টিয়া প্রবল উৎসাহের সঙ্গে একটা ওয়েডিং গাউন পছন্দ করতে বলল। কী মুসিবত। আমি ওয়েডিং গাউনের কি জানি? আসলেই এ ব্যাপারে আমি অজ্ঞ। ওয়েডিং গাউন বলতে আমার মনে পড়ে প্রিন্সেস ডায়ানার বিয়ের দৃশ্য। সেই টেলিভিশনে দেখা- ডায়ানার বিয়ে। সারা দুনিয়াই দেখেছে। ওয়েডিং গাউন পরে গর্বিত মরালীর মতো ডায়ানার হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য এখনও চোখে ভাসে। তার পরিণতির কথা না হয় নাই ভাবলামবললাম, “আমি তো এ ব্যাপারে নিতান্তই অজ্ঞ। তবে তুমি ওয়েডিং গাউনের দোকানে না যেয়ে অনলাইনে কেন খুঁজছ”?

জেসির মুখে রহস্যময় দুষ্টুমি মাখানো হাসির আভা দেখা গেল। জেসি বেশ মজার। বড় হয়েছে, কিন্তু দুষ্টুমিতে এখনও স্কুলের বালিকা। মাঝে মাঝে টেবিল টেনিস খেলার সময় তার প্রকাশ ঘটে। বলল, “তুমিতো আসল ঘটনা জানো না”।
-“আসল ঘটনা কি”? জানতে চাইলাম।

আসল ঘটনা টিয়া নিজেই বলল, “আমি আমার বিয়ের গাউন নিজেই ডিজাইন করবো আর সেলাই করবো”।

তা অবাক হওয়ার মতোই ঘটনা। বিয়ের কনে নিজের শাড়ী নিজে সেলাই করে এমন কথা তো আসলেই কখনও শুনিনি। বিয়ের শাড়ী কিনতে সবাইকে কত গলদঘর্ম হতে দেখি। মনের মতো বিয়ের শাড়ী পাওয়া কনে পাওয়ার চেয়েও কঠিনঅনেককে কলকাতা-চেন্নাই থেকে বিয়ের শাড়ী আনে তারপরও কত নখরা। রং মেলেনা, নকশা ঠিক না, এটা কেমন যেন, ওটা কেমন যেন। কনের গায়ে মানায় না। কত বিচার বিবেচনা। শুনেছি ওয়েডিং গাউন নাকি খুব দামী হয়। অবশ্য স্বীকার করতেই হবে বিয়ে ব্যাপারটিই অতি ব্যয়বহুলহয়তো সে কারণে “বিদগ্ধ” ব্যক্তিরা সস্তা দুগ্ধের সন্ধান করতে উৎসাহিত হন। তারপরও সবাই একটি নয়ন জুড়ানো মন ভুলানো সুদৃশ্য ওয়েডিং গাউন চায়। চ্যাপেল স্ট্রীটেও সেকেন্ড হ্যান্ড ওয়েডিং গাউনের কয়েকটা দোকান দেখেছি। অনেকে কয়েক ঘণ্টার জন্য নাকি ওয়েডিং গাউন ভাড়াও করে নিয়ে যায়। সেসব  বাদ দিয়ে এ মেয়ে নিজের বিয়ের গাউন নিজে সেলাই করবে!

টিয়া মুচকি হেসে বলল, “তুমি অমন অবাক হয়ে চোখ কপালে তুলছ কেন? ওয়েডিং গাউন বানানো তেমন কোন কঠিন কাজ না। শুধু বাজার থেকে কিছু  মখমলের কাপড় কিনতে হবে। তারপরের কাজ খুব সহজ। আমার মায়ের বিয়ের গাউনও মা নিজে বানিয়েছিল”।


আমি তো লা জওয়াব। মনে মনে ওর মায়ের তারিফ না করে পারলাম না। আমার এক বন্ধুর কথা মনে পড়লো।  অনেকদিন আগে তার অভিজ্ঞতা থেকে আমাকে কিছু জ্ঞান দান করেছিল। বলেছিল, “দেখবি মেয়েরা সবসময় মায়েরই কার্বন কপি হয়”। সেই জ্ঞানের জ্যান্ত উদাহরণ চোখের সামনে দেখতে পেয়ে বড়ই বিস্ময় অনুভব করলাম। আসলেই পৃথিবীতে সপ্তমাশ্চর্য বস্তু ছাড়াও আশ্চর্য হওয়ার মতো আরও অনেক কিছু আছে। 

Wednesday, 18 June 2014

একটি এনগেজমেন্ট রিংয়ের গল্প

মেয়েদের জীবনে এনগেজমেন্ট রিং যে এত আনন্দের বিষয় তা আসলে আগে খেয়াল করিনি। খেয়াল করিনি বললে ভুল হবে। মানে সেভাবে এটা চোখে পড়েনি। টিয়া নামে একটি মেয়ে আমার সঙ্গে কাজ করে। এমনিতে খুব চুপচাপ শান্ত স্বভাবের। ওকে দেখে আমার কেন যেন বাংলার সরল বধুর ছবি মনে পড়ে। কিন্তু টপস স্কার্ট পরা টিয়া নিখাদ অস্ট্রেলিয়ান সোনালী চুলওয়ালা সাদা চামড়ার মেয়ে।
সেদিন সকালে হাসতে হাসতে টিয়া আমার দিকে এগিয়ে এলো।     
“গুড মর্নিং” বলেই টিয়া জিজ্ঞেস করে,“জানো গত সন্ধ্যায় কি ঘটেছে?” আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাই। টিয়া তার আঙুলগুলি এগিয়ে দিলো। রিং ফিঙ্গারে জ্বল জ্বল করছে একটি হীরের আংটি। বোঝা যায় অনেক পুরনো অ্যান্টিক আংটি, কিন্তু হীরেটা অনেক বড়। হীরের দ্যুতির মতোই ওর চোখ-মুখ দিয়ে খুশী আর আনন্দ ঝরছে। জিজ্ঞেস করলাম, “ব্যাপারটা কি?”
টিয়া কথা বলে খরস্রোতা নদীর মতোওর কথার বন্যার ভিতর থেকে বুঝলাম এটা এনগেজমেন্টের রিং। গতকাল দিনটা ওর শুরু হয়েছিল সাদামাটা ভাবেই। বরাবরই দেখেছি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মেয়েটি কম্পিউটারে মাথা গুঁজে কাজ করে। গতকাল সন্ধ্যার সময় ওর বন্ধু জন তাকে কফি খেতে ডেকেছিল। জন আইটি সেকশনে কাজ করে। বেশ কিছুদিন ধরে ওদের বন্ধুত্ব চলছিল। তাই টিয়া ওর সঙ্গে কফি খেতে সাগর তীরে চলে যায়। তখন গোধূলি। সাগরের তীরে ঢেউ দেখতে দেখতে মাতাল হাওয়ার মাঝে বালুর ওপর দুজনে বসে কফি খাচ্ছিল। আর তখনই জন কাজটি করে। সে টিয়াকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে?”  টিয়া খুব অবাক হয়েছিল। আনন্দ এবং উত্তেজনায় তার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। কিন্তু সে এই মুহূর্তটির জন্যইতো অপেক্ষা করছিলো। তার মাথা ঝুঁকানো দেখেই জন পকেট থেকে হীরের আংটিটি বের করে তার হাতে পড়িয়ে দেয়। টিয়া অ্যান্টিক জিনিস বেশী পছন্দ করে। এই জন্য জন অ্যান্টিক শপ থেকে দ্বিগুণ দাম দিয়ে দেড়শ বছর পুরনো হীরের আংটিটি কিনেছে। আংটি হাতে টিয়ার  চোখ থেকে ঝর ঝর করে পানি পড়তে থাকে। তখন পশ্চিম আকাশে সূর্য সাগরে ডুবছে।
টিয়া বাসায় ফিরতে চায়। কিন্তু জন তাকে তার বাসায় যেতে আমন্ত্রণ জানায়।
ওরা যখন জনের বাসায় পৌঁছায় তখন রাতের ডিনারের সময় হয়ে গিয়েছে।
ডিনার টেবিলে টিয়ার জন্য আরও সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছিলো। টেবিলে ডিনারের নানা পদের খাবার সাজানো রয়েছে। কিন্তু তারচেয়ে বড় কথা জনের বাবা-মা, বড় বোন এবং বোনের হাজব্যান্ডসহ টিয়ার বাবা-মা এবং আরও কয়েকজন অপেক্ষা করছেনজন ওকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য এসব আয়োজনের কথা আগে বলেনি।
টিয়া আমাকে এই গল্প বলতে বলতে তার জীবনের সেরা ডিনার নাইটের স্মৃতিতে হারিয়ে যায়  মনে হয়আমি অবাক হয়ে ওর দিকে অপলক তাকিয়ে থাকি। একটি সুখী মেয়ের মুখ দেখি। ওর মুখখানি হীরের মতোই জ্বল জ্বল করছে। আমি ওকে অভিনন্দন জানাই। কিন্তু সেটা সে শুনতে পায় কিনা বোঝা যায় না।
এনগেজমেন্টের আংটি পরা টিয়ার আনন্দ দেখে আমার একটা কথাই মনে হয়। আধুনিকতা বলি আর পশ্চিমা সভ্যতা বলি, চিরন্তন নারীর এই মধুর রূপ হারিয়ে যাওয়ার নয়।

  

Friday, 7 February 2014

একজন অশ্বারোহীর তাকে আলিঙ্গন


আজকাল তার বড় অস্থির লাগে। 
বিরাশি বছরের জীবনে এমন অস্থিরতা কখনও বোধ করেছেন বলে মনে পড়ে না। কিন্তু গত কয়েকদিন চঞ্চলতা পেয়ে বসেছে। মনে হচ্ছে কোথায় যেন এক শূন্যতা; কোথাও তার যাওয়ার কথা, কিন্তু এখনও যাওয়া হয়নি। মাঝে মাঝে তার স্ত্রীর কথা মনে পড়ছে। দুই  বছর মহিলা তাকে একেবারেই একা রেখে পরপারে চলে গিয়েছেন। এক ছেলে, এক মেয়ে । তারা তাদের ঘর-সংসার নিয়ে ব্যস্ত। কেউ হয়তো ছুটির বিকেলে এসে কিছুক্ষণের জন্য ঘুরে যায়। আসার সময় কিছু খাবার-দাবার নিয়ে আসে। তারা তাকে খুবই ভালবাসে। আন্তরিক ভাবেই জানতে চায় তার কি লাগবে? আর কিছু আনতে হবে কিনা? কোথাও বেড়াতে যাবে কিনা? তাদের উপস্থিতি ভালই লাগে। কিন্তু তারা চলে গেলে শূন্যতাটা আরও অসহ্য হয়ে ওঠে। সেদিন বিকেলে মেয়েটা তার ছোট দুই নাতনীকে নিয়ে এসেছিল। অনেকক্ষণ তারা নানার পাশে বশে বকবক করলো। আস্তাবলের ঘোড়া তিনটের  সঙ্গে খেলার চেষ্টা করলো। রাতে যাওয়ার আগে মেয়ে তাকে শরীরের যত্ন নেওয়ার নানান উপদেশ দিলো।
ঘুম তার অনেক  দিন ধরেই বেশ পাতলা। বিছানার পাশের জানলা গলিয়ে জ্যোৎস্না ঢেলে পড়ছে। উঠে বারান্দায় বসে কিছুক্ষণ জ্যোৎস্না ধোয়া উঠোনের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকেন। ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক শুনতে থাকেন। 
ভোরের আলো ফোটার আগেই তিনি ঘোড়ার পিঠে চেপে বসেন।
ছোট ছোট কদমে ঘোড়া ছুটে চলেছে। তিনি বুক ভরে দম নিচ্ছেন। আর চার পাশের প্রকৃতি গাছ লতা পাতা  চোখ ভরে দেখছেন। কত চেনা মাঠ ঘাট। ইচ্ছে হয় সবকিছু হাত দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতে। প্রতিবেশী অনেকে তাকে দেখে অবাক হয়। সাত সকালে কোথায় চলেছেন জানতে চায়। তিনি মৃদু হাসেন। নিচু কণ্ঠে বলেন, “অনেক দিন বের হই না। যাই একটু ঘুরে আসি”।
বৃদ্ধ অশ্বারোহী চলতে থাকেন। পুরনো স্মৃতি জড়ানো পথ মাড়িয়ে ঘোড়া চলতে থাকে। সেই খেলার মাঠ। সেই নদী। কৈশোর, যৌবনের কত দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে যায়।
দুপুর হয়। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়। রাতের চাদরে ঢেকে যায় চারদিক। আবার পূব আকাশে সূর্য ওঠে। তাকে নেশায় পেয়ে বসে। উনি চলতে থাকেন। চেনা পথ এবং প্রকৃতির মাঝে নিজেকে অনুভব করতে থাকেন। এভাবে কতদিন পার হয় হয়তো সেটা তার নিজেরও মনে নেই।
শ্রান্ত ক্লান্ত বিরাশি বছর বয়সের শরীর টেনে তিনি যখন ছয় সপ্তাহ পরে নিজের বাড়ীর দরজায় ঢুকলেন তখন চারদিকে বড়দিনের আয়োজন চলছে। ঘরে ঢুকে লাইট না জ্বালিয়ে সোজা বিছানায় শুয়ে পড়লেন। আজ তার মনে পরম এক প্রশান্তি। আর কোন অস্থিরতা, কোন চঞ্চলতা অনুভব করেন না। আস্তে আস্তে ঘুমের ভারে তার চোখ দুটো বুজে আসে।
বড়দিনের সকালে তার পুত্র শুভেচ্ছা জানাতে এসে দেখতে পায় ক্লান্ত অশ্বারোহী তখনও গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। কিন্তু তার পুত্র তাকে আর ঘুম থেকে জাগাতে পারেনি।