আগে এখনকার মতো ফটোকপি মেশিন ছিলনা, স্ক্যানারও ছিল না। কোন কিছু কপি করতে
হলে আমরা কার্বন পেপার ব্যবহার করতাম। এখন তো কার্বন পেপারের চল প্রায় উঠেই
গিয়েছে। কোন লেখা কপি করার জন্য কার্বন পেপার দিয়ে লিখলে কি সুন্দর হুবহু লেখাটা
উঠত। আমি অনেক কিছু দেখেই অকারণে অবাক হই। কার্বন পেপারে লেখা দেখে অবাক হওয়া আমার
জীবনের প্রথম অবাক হওয়ার মতো একটি বিষয়। একথা কেন আসলো সেটাই বলছি।
সেদিন বিকেলে দেখি টিয়া আর তার বান্ধবী কম্পিউটারের ওপর ঝুঁকে কি যেন খুব
মনোযোগ দিয়ে দেখছে। আমি কৌতূহলী হয়ে ওদের দিকে এগিয়ে গেলাম।
জেসি এক গাল হেসে বলল, “টিয়ার ওয়েডিং গাউন পছন্দ করছি”।
দেখলাম পিনটারেস্টের পেজে অনেক ওয়েডিং গাউনের ছবি। টিয়া প্রবল উৎসাহের
সঙ্গে একটা ওয়েডিং গাউন পছন্দ করতে বলল। কী মুসিবত। আমি ওয়েডিং গাউনের কি জানি?
আসলেই এ ব্যাপারে আমি অজ্ঞ। ওয়েডিং গাউন বলতে আমার মনে পড়ে প্রিন্সেস ডায়ানার
বিয়ের দৃশ্য। সেই টেলিভিশনে দেখা- ডায়ানার বিয়ে। সারা দুনিয়াই দেখেছে। ওয়েডিং গাউন
পরে গর্বিত মরালীর মতো ডায়ানার হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য এখনও চোখে ভাসে। তার পরিণতির
কথা না হয় নাই ভাবলাম। বললাম, “আমি তো এ
ব্যাপারে নিতান্তই অজ্ঞ। তবে তুমি ওয়েডিং গাউনের দোকানে না যেয়ে অনলাইনে কেন খুঁজছ”?
জেসির মুখে রহস্যময় দুষ্টুমি মাখানো হাসির আভা দেখা গেল। জেসি বেশ মজার। বড়
হয়েছে, কিন্তু দুষ্টুমিতে এখনও স্কুলের বালিকা। মাঝে মাঝে টেবিল টেনিস খেলার সময়
তার প্রকাশ ঘটে। বলল, “তুমিতো আসল ঘটনা জানো না”।
-“আসল ঘটনা কি”? জানতে চাইলাম।
আসল ঘটনা টিয়া নিজেই বলল, “আমি আমার বিয়ের গাউন নিজেই ডিজাইন করবো আর সেলাই
করবো”।
তা অবাক হওয়ার মতোই ঘটনা। বিয়ের কনে নিজের শাড়ী নিজে সেলাই করে এমন কথা তো
আসলেই কখনও শুনিনি। বিয়ের শাড়ী কিনতে সবাইকে কত গলদঘর্ম হতে দেখি। মনের মতো বিয়ের
শাড়ী পাওয়া কনে পাওয়ার চেয়েও কঠিন। অনেককে কলকাতা-চেন্নাই থেকে বিয়ের শাড়ী আনে। তারপরও কত নখরা। রং মেলেনা, নকশা ঠিক না, এটা কেমন যেন,
ওটা কেমন যেন। কনের গায়ে মানায় না। কত বিচার বিবেচনা। শুনেছি ওয়েডিং গাউন নাকি খুব
দামী হয়। অবশ্য স্বীকার করতেই হবে বিয়ে ব্যাপারটিই অতি ব্যয়বহুল। হয়তো সে কারণে “বিদগ্ধ” ব্যক্তিরা সস্তা দুগ্ধের সন্ধান করতে উৎসাহিত হন।
তারপরও সবাই একটি নয়ন জুড়ানো মন ভুলানো সুদৃশ্য ওয়েডিং গাউন চায়। চ্যাপেল
স্ট্রীটেও সেকেন্ড হ্যান্ড ওয়েডিং গাউনের কয়েকটা দোকান দেখেছি। অনেকে কয়েক ঘণ্টার
জন্য নাকি ওয়েডিং গাউন ভাড়াও করে নিয়ে যায়। সেসব
বাদ দিয়ে এ মেয়ে নিজের বিয়ের গাউন নিজে সেলাই করবে!
টিয়া মুচকি হেসে বলল, “তুমি অমন অবাক হয়ে চোখ কপালে তুলছ কেন? ওয়েডিং গাউন
বানানো তেমন কোন কঠিন কাজ না। শুধু বাজার থেকে কিছু মখমলের কাপড় কিনতে হবে। তারপরের কাজ খুব সহজ।
আমার মায়ের বিয়ের গাউনও মা নিজে বানিয়েছিল”।
আমি তো লা জওয়াব। মনে মনে ওর মায়ের তারিফ না করে পারলাম না। আমার এক বন্ধুর
কথা মনে পড়লো। অনেকদিন আগে তার অভিজ্ঞতা
থেকে আমাকে কিছু জ্ঞান দান করেছিল। বলেছিল, “দেখবি মেয়েরা সবসময় মায়েরই কার্বন কপি
হয়”। সেই জ্ঞানের জ্যান্ত উদাহরণ চোখের সামনে দেখতে পেয়ে বড়ই বিস্ময় অনুভব করলাম। আসলেই
পৃথিবীতে সপ্তমাশ্চর্য বস্তু ছাড়াও আশ্চর্য হওয়ার মতো আরও অনেক কিছু আছে।

No comments:
Post a Comment